এমটি কায়রোসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: কেমন আছেন বাংলাদেশি নাবিকরা?

1764474661-0098732000de26349f66ad259c26432b.webp
আনোয়ার হোসেন

ক্রুড অয়েল ভরার জন্য মিশরের সুয়েজ বন্দর থেকে রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নভোরোসিস্ক যাচ্ছিল ২৭৫ মিটার লম্বা চীনা জাহাজ ‘এমটি কায়রোস’। কৃঞ্চ সাগর অতিক্রম করার সময় তুরস্কের জলসীমায় ইউক্রেইনের ‘ড্রোন বোট’ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণের শিকার হয় জাহাজটি।

ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সৃষ্ট ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কারণে দুই ঘণ্টার মধ্যে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় ‘এমটি কায়রোস’কে। তুরস্কের কোস্ট গার্ডের সদস্যরা উদ্ধার করে আগুন লাগা জাহাজের ২৫ নাবিককে। তাদের মধ্যে আছেন চার বাংলাদেশিও। জাহাজটির ২৫ নাবিক সুস্থ থাকলেও হামলার ‘ঘোর’ কাটছেই না তাদের। খবর বিডি নিউজের

অন্য নাবিকদের মধ্যে চীনের ১৯ জন এবং মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়ার একজন করে আছেন। ওই জাহাজ থেকে উদ্ধার হওয়া চার বাংলাদেশি হলেন, চতুর্থ প্রকৌশলী মাহফুজুল ইসলাম, অয়েলার হাবিবুর রহমান, পাম্প ম্যান আসগর হোসাইন ও ডেক ক্যাডেট আল আমিন হোসেন।

কায়রোসের ২৫ নাবিক হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর বর্তমানে তুরস্কের ইজমিত শহরে দেশটির কোস্ট গার্ডের হেফাজতে রয়েছেন। শনিবার রাতে কথা হয় বাংলাদেশি নাবিক প্রকৌশলী মাহফুজুল হকের সাথে।

ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, “আমরা মিশরের পোর্ট সুয়েজ থেকে খালি জাহাজ নিয়ে রাশিয়ার নভোরোসিস্ক বন্দরে যাচ্ছিলাম। বসফরাস প্রণালি পার হয়ে শুক্রবার কৃঞ্চ সাগর (ব্ল্যাক সি) অতিক্রম করছিলাম। তুরস্কের জলসীমায় কৃঞ্চ সাগরে ২৮ থেকে ৩০ নটিক্যাল মাইল দূরত্ব অতিক্রম করার পর স্থানীয় সময় বিকাল পৌনে ৫টা থেকে ৪টা ৫০ মিনিটের মধ্যে মিসাইল আক্রমণ করে।

‌‌‘প্রথমটি জাহাজের প্রপেলারে গিয়ে আঘাত করে এবং সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১০ মিনিট পরেই আরেকটি মিসাইল আক্রমণ হয়। সেটি জাহাজের ইঞ্জিন কক্ষের ফুয়েল ট্যাংকারে আঘাত হানার পর আগুন ধরে বিস্ফোরণ ঘটে। আগুন লাগার এক ঘণ্টার মধ্যে জাহাজের ক্যাপ্টেন তুরস্কের কোস্ট গার্ডের সাথে যোগাযোগ করে সাহায্য প্রার্থনা করেন। দুই ঘণ্টা পর কোস্ট গার্ডের সদস্যরা আমাদের উদ্ধার করে কাছাকাছি ইজমিত শহরে নিয়ে যান।’

প্রকৌশলী মাহফুজুল বলেন, ‘আমাদের সবাইকেই শহরের একটি হাসপাতালে নিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয় প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এখন আমরা সকলেই তুরস্কের কোস্ট গার্ডের সদস্যদের হেফাজতে সেই শহরেই আছি পরবর্তী নির্দেশের জন্য।’

ইউক্রেইনের ড্রোন বোট থেকে ক্ষেপণাস্ত্র দুটি ছোড়া হয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘রাশিয়ান জাহাজ মনে করে সমুদ্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচলরত ড্রোন বোট থেকেই হামলা করা হয়েছে।’

‘এমটি কায়রোস’কে চীনা বলা হলেও সেটি মূলত রাশিয়ার ‘ছায়া বহর’ বলে মনে করেন মাহফুজুল ইসলাম।

জাহাজটি রাশিয়ার ক্রুড অয়েল বিভিন্ন দেশে পৌঁছানোর কাজ করতো বলে যুদ্ধরত ইউক্রেইন এ মামলা চালিয়েছে বলে বাংলাদেশি নাবিকেরা জেনেছেন। রাশিয়া থকে ক্রুড অয়েল বোঝাইয়ের পর জাহাজটির পরবর্তী গন্তব্য ছিল চীন অথবা ভারত।

রয়টার্স লিখেছে, কায়রোস ছাড়াও বিরাত বলে একটি ট্যাঙ্কারে নৌ-ড্রোন আঘাত হানার কথা জানিয়েছেন ইউক্রেইনের এক কর্মকর্তা।

গোয়েন্দা সংস্থার ওই কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ট্যাঙ্কার দুটি রাশিয়ার নভরোসিয়েস্ক বন্দরের দিকে যাচ্ছিল।

কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল টার্মিনাল এই নভরোসিয়েস্ক বন্দর। ওই কর্মকর্তার পাঠানো ভিডিওতে দেখা গেছে, নৌ-ড্রোনগুলো দ্রুত গতিতে বিশাল ট্যাঙ্কারগুলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তারপর শক্তিশালী বিস্ফোরণে জাহাজগুলোতে আগুন ধরে যায়।

পরিচয় না প্রকাশ করা শর্তে ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা এক লিখিত বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ভিডিওতে দেখা গেছে, আঘাত লাগার পর দুটি ট্যাঙ্কারই অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এগুলো কার্যত ব্যবহার অযোগ্য হয়ে গেছে। এতে রাশিয়ার তেল পরিবহনে উল্লেখযোগ্য ধাক্কা লাগবে।’

এ হামলার বিষয়ে রাশিয়া প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।

ইউক্রেইন বারবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে রাশিয়ার ‘ছায়া বহর’ এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে আসছে। তারা বলছে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা থাকা পরও এ নৌবহর রাশিয়াকে বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি ও ইউক্রেইনে চলমান যুদ্ধে অর্থায়ন করতে সহায়তা করছে।

‘হামলার ঘোর এখনো কাটছে না’

এমটি কায়রোসের চতুর্থ প্রকৌশলী হিসেবে কয়েক বছর ধরে কাজ করছেন বাংলাদেশি নাবিক মাহফুজুল ইসলাম। বাংলাদেশ নেভাল অ্যাকাডেমির ৫৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী মাহফুজ সমুদ্রগামী জাহাজে নাবিক হিসেবে কাজ শুরু করেন চার বছর আগে।

নরসিংদীর ছেলে মাহফুজ (২৫) তার জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘোর এখনো কাটাতে পারছেন না। কেবল তিনিই নন, জাহাজটি থেকে উদ্ধার হওয়া সব নাবিক হাসপাতাল ছাড়লেও মানসিক ‘আঘাত’ রয়েই গেছে।

মাহফুজুল বলেন, ‘যখন মিসাইল জাহাজে পড়ে আগুন লেগে বিস্ফোরণ ঘটল, তখন আমরা কয়েকজন ডেকে দাঁড়িয়েছিলাম। তখন মনে হচ্ছিল সব শেষ হয় যাচ্ছে। তার পরও আমরা জাহাজ থেকে বেঁচে হাসপাতালে যেতে পেরেছি, বড় কোনো ক্ষতি হয়নি…এটা অবিশ্বাস্য। মিসাইল হামলার সময় শুধু পরিবারের সদস্যদের কথাই মনে হচ্ছিল।’

ওই সময়ের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতন নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এখনো আমরা কেউ পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারিনি। তুরস্কের কোস্ট গার্ডের সদস্যরা যেন আমাদের ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন সেই সময়।’

পরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হয় বলে জানান তিনি।

তুরস্কে বাংলাদেশ দূতাবাসের কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি দাবি করে মাহফুজুল বলেন, ‘আমাদের সাথে পাসপোর্ট রয়েছে, তেমন কিছু হওয়ার কথা না। তার পরও আমাদের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হবে।’

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন বলন, ‘ব্ল্যাক সিতে একটি জাহাজে মিসাইল হামলা হয়। ওই জাহাজের ২৫ নাবিকের মধ্যে চারজন বাংলাদেশি। তাদের উদ্ধার করা হয়েছে এবং চিকিৎসাও দেওয়া হয়েছে। আমরা তাদের নিয়মিত খোঁজ রাখছি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top