মনপুরার দেড় লাখ মানুষ প্রতিদিন ঝুঁকিতে: বিকেল ৩টার পর মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ

বিকেল-৩টার-পর-অসহায়-হয়ে-পড়েন-মনপুরা-দ্বীপের-দেড়-লক্ষ-মানুষ.jpg

বিকেল-৩টার-পর-অসহায়-হয়ে-পড়েন-মনপুরা-দ্বীপের-দেড়-লক্ষ-মানুষ

আনোয়ার হোসেন

দুর্বিষহ যাতায়াত ব্যবস্থা, ফিটনেসবিহীন নৌযানেই চলছে মানুষের জীবনযুদ্ধ

ভোলার দ্বীপ উপজেলা মনপুরা—প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো এই দ্বীপে বসবাস করে প্রায় দেড় লাখ মানুষ। নৌপথ ছাড়া এখানে অন্য কোনো স্থায়ী যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই। নিরাপদ নৌপথের অভাবে প্রতিদিন মানুষজন উত্তাল মেঘনা নদী পাড়ি দেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। দুপুর ৩টার পর মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দ্বীপবাসীর যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।


🚤 দুর্বিষহ যাতায়াত ব্যবস্থা

মনপুরার মানুষের একমাত্র ভরসা রামনেওয়াজ ও জনতা লঞ্চঘাট। প্রতিদিন প্রায় চার হাজার যাত্রী এই দুটি ঘাট ব্যবহার করে ঢাকা, ভোলা ও চরফ্যাশনসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করেন।
বিগত এক দশকে এসব ঘাটে উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়ন না হওয়ায় শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

📰 আরও পড়ুন: মনপুরায় অবৈধ স-মিল দিয়ে চলছে রমরমা ব্যবসা, ধ্বংস হচ্ছে বনাঞ্চল


🌧️ বর্ষায় চরম ভোগান্তি

বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানিতে ঘাট তলিয়ে যায়, ফলে কোমরসমান কাদা মাড়িয়ে যাত্রীদের লঞ্চে উঠতে হয়
ঘাটের ভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে লঞ্চে ওঠা-নামা হয়ে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ। অসাধু শ্রমিকরা সুযোগ নিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে।


💸 ভাড়া অনিয়ম ও অতিরিক্ত খরচ

বিআইডব্লিউটিএ নির্ধারিত টিকিট মূল্য ৫ টাকা, কিন্তু বাস্তবে আদায় করা হচ্ছে ১০ টাকা
বর্ষায় নৌকায় ওঠা-নামার জন্য অতিরিক্ত ২০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।
একটি যাত্রায় মোট খরচ দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত।


⚠️ ফিটনেসবিহীন নৌযান, জীবনের ঝুঁকি

জনতা বাজার ঘাটের দুটি কাঠের লঞ্চ ফিটনেসবিহীন। বর্তমানে কেবল ‘এসটি শেখ কামাল’ সি-ট্রাক বৈধভাবে চলাচল করছে।
তবে সেটি বন্ধ থাকলে যাত্রীরা অননুমোদিত ট্রলার ও স্পিডবোটে উত্তাল মেঘনা পার হন, যা জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।


🎓 শিক্ষার্থী ও পর্যটকদের দুর্ভোগ

ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পড়াশোনার জন্য যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীরা লঞ্চঘাটের দুরবস্থার কারণে অত্যন্ত কষ্টে পড়ছেন
পর্যটকরাও অভিযোগ করেছেন, অন্ধকার, কাদা ও অনিরাপদ অবস্থা মনপুরার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগে বাধা সৃষ্টি করছে।


🚫 অবৈধ নৌযান ও শ্রমিকদের অতিরিক্ত আদায়

মনপুরা–তজুমদ্দিন নৌপথে অনুমোদনবিহীন স্পিডবোট, ট্রলার ও পুরনো সি-ট্রাক দিয়ে যাত্রী পারাপার করা হয়।
এর ফলে যাত্রীদের অতিরিক্ত খরচ, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।


🏛️ প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া

ভোলা বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তা মোঃ শহীদুল ইসলাম বলেন,

“রামনেওয়াজ লঞ্চঘাটটি বর্ষার সময় জোয়ারে তলিয়ে যায়। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কথা বলা হয়েছে।”

মনপুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে রাব্বি বলেন,

“ঘাট ও যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় চলছে। আশা করি শীঘ্রই টেকসই সমাধান আসবে।”


🗣️ স্থানীয়দের দাবি

মনপুরা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মহিব্বুল্লাহ ইলিয়াছ বলেন,

“নিরাপদ নৌপথ না থাকায় দেড় লাখ মানুষ দিনের পর দিন বন্দী হয়ে আছে। রোগী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী—সবারই জীবনের ঝুঁকি রয়েছে। সরকারী হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”

স্থানীয় বাসিন্দা ফারুক জানান,

“জোয়ারে পল্টুন কোমরসমান পানির নিচে চলে যায়। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও রোগীদের লঞ্চে ওঠাতে হিমশিম খেতে হয়। রাস্তাটি উঁচু করা হলে এমন দুর্ভোগ হতো না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top