লেবাননের ভেতরে দেওয়াল তৈরি করেছে ইসরাইল

b5-2511151930.jpg
আনোয়ার হোসেন

লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরাইলি সেনারা দেওয়াল তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘে লেবাননের অন্তর্বর্তী শান্তিরক্ষা বাহিনী (ইউনিফিল) পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, দক্ষিণ-পশ্চিম লেবাননের ইয়রুন এলাকায় জাতিসংঘের নির্ধারিত ব্লু লাইন অতিক্রম করে দেওয়াল নির্মাণ করেছে ইসরাইলি বাহিনী। শনিবার জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছেন। ব্লু লাইন হলো জাতিসংঘ নির্ধারিত একটি রেখা, যা লেবাননকে ইসরাইল ও ইসরাইল অধিকৃত গোলান মালভূমি থেকে পৃথক করেছে।

এদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় সম্ভাব্য শান্তিরক্ষা বাহিনীতে যোগ দেবে ইন্দোনেশিয়া। এ জন্য দেশটিতে ২০ হাজার সেনাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা গাজার স্বাস্থ্য ও নির্মাণ সম্পর্কিত কাজগুলো পরিচালনা করবে। শনিবার এসব তথ্য জানান দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী সাজাফ্রি সাজামসোয়েদ্দিন। অন্যদিকে গাজার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা ধীর গতিতে এগুনোর মধ্যেই ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী গোষ্ঠী হামাস নতুন করে ভূখ-টিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে। গাজাবাসীরা বলছেন, মুরগির দাম নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে সিগারেটের ওপর ফি ধার্যের মাধ্যমে হামাস কতৃত্ব বিস্তারের চেষ্টা নিয়েছে। এর ফলে যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী হামাসের গাজার শাসনক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। খবর ওয়াফা নিউজ ও আলজাজিরার।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেছেন, ইসরাইলের তৈরি কংক্রিটের টি-আকৃতির দেওয়ালের কারণে প্রায় ৪ হাজার বর্গমিটারের বেশি জমি লেবাননের স্থানীয় মানুষের জন্য ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এছাড়া ইয়রুনের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আরও একটি দেওয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে, যা এরইমধ্যে ব্লু লাইন অতিক্রম করেছে। মহাসচিবের মুখপাত্র আরও বলেন, শান্তিরক্ষীরা ইসরাইলি সেনাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছে এবং দেওয়াল সরানোর দাবি জানিয়েছে।

এক বিবৃতিতে ইউনিফিল জানিয়েছে, ইসরাইলের লেবাননের ভূখ-ে উপস্থিতি ও দেওয়াল নির্মাণ লেবাননের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে এবং এটি নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাবনাও ভঙ্গ করছে। তবে জাতিসংঘের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র বলেন, এই দেওয়াল আইডিএফের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। যার নির্মাণ কাজ ২০২২ সালে শুরু হয়।

যুদ্ধ শুরুর পর অর্জিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উত্তর সীমান্তে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি। ইউনিফিলের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শান্তিরক্ষী বাহিনী লিতানি নদী থেকে দক্ষিণে ব্লু লাইন পর্যন্ত এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনা করে। মিশনটিতে ৫০টি দেশের ১০ হাজারের বেশি শান্তিরক্ষী ও প্রায় ৮০০ বেসামরিক কর্মকর্তা কর্মরত আছেন।
এদিকে ইন্দোনেশিয়া গাজায় একটি বহুজাতিক বাহিনীর পরিকল্পনা নিয়ে অনেক দেশের সঙ্গে আলোচনা করেছে। যারা গাজায় স্থিতিশীলতা আনতে কাজ করবে। যার মধ্যে রয়েছে আজারবাইজান, মিসর এবং কাতার। গত সপ্তাহে রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানায়- ওয়াশিংটন এমন একটি বাহিনীর প্রস্তুতি নিয়ে একটি খসড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যা গাজাকে সামরিকীকরণ, এর সীমান্ত সুরক্ষিত, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং ত্রাণ সরবরাহ এবং একটি নতুন প্রশিক্ষিত ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষমতা দেবে।

তবে ইন্দোনেশিয়া জানিয়েছে কখন সেনা মোতায়েন করা হবে এবং তাদের কী ম্যান্ডেট থাকবে সে সম্পর্কে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী সাজাফ্রি সাজামসোয়েদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সর্বোচ্চ ২০,০০০ সৈন্য প্রস্তুত রেখেছি। তবে স্বাস্থ্য এবং নির্মাণ সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে তারা আপাতত কাজ করবে। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে চলা বিমান হামলার মধ্যে গাজাবাসীর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে উঠেছে শীতকালীন বৃষ্টি। ডুবে গেছে লাখ লাখ ঘরছাড়া মানুষের আশ্রয়শিবির। জাতিসংঘ যখন সতর্ক করে আসছে যে ইসরাইলি নিষেধাজ্ঞার কারণে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি পরিবারের কাছে পর্যাপ্ত আশ্রয় সামগ্রী পৌঁছানো যাচ্ছে না, ঠিক সেই সময়ে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপত্যকার বাসিন্দাদের আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।

রাতভর বৃষ্টিতে শনিবার সকালে তাঁবু খোলার পর দেখা গেছে ভেতরে হাঁটুসমান পানি। ভিজে গেছে শিশুদের কাপড় ও খাবার। গাজা সিভিল ডিফেন্স বলছে, সরঞ্জামহীন অবস্থায় তারা শত শত সহায়তার আবেদন পাচ্ছে। কিন্তু সাড়া দেওয়ার মতো সক্ষমতা নেই। বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি আব্দুর রহমান আসালিয়াহ আলজাজিরাকে বলেন, বন্যায় বাসিন্দাদের কাপড়সহ অন্যান্য সব জিনিসপত্র ভিজে গেছে। তিনি বলেন, আমরা সাহায্যের জন্য আবেদন করেছি। নতুন তাঁবু দরকার যা অন্তত শীতের ঠান্ডা থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে। এলাকা থেকে পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রায় দুই ডজন মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। গাজার বাস্তুচ্যুত এই বাসিন্দা আরও বলেন, শীতকালীন এই বৃষ্টি আল্লাহর আশীর্বাদ, কিন্তু এখন অনেক পরিবারই এই বৃষ্টি চায় না। তাদের সন্তানদের জীবন ও নিজেদের বেঁচে থাকা নিয়ে ভয়ে আছ।
গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, বন্যায় মূলত উপত্যকার উত্তরে ফিলিস্তিনিরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত মাসে ইসরাইল ও  হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর লাখ লাখ বাসিন্দা এখানে ফিরে এসেছিল। এদিকে গত মাসে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই হামাস দ্রুত ইসরাইলের সেনা প্রত্যাহার করা এলাকাগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। সে সময় ইসরাইলের সঙ্গে সহযোগিতা কিংবা চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে তারা ডজনের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে।

বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো হামাসকে নিরস্ত্র হওয়া এবং গাজার শাসন ছাড়ার দাবি জানালেও এই শূন্যতা কে পূরণ করবে, তা নিয়ে এখনো মতৈক্য হয়নি। গাজাবাসী বলছেন, প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় তারা হামাসের নিয়ন্ত্রণ আরও বেশি অনুভব করতে পারছেন। গাজায় হামাস নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে প্রবেশ করা প্রায় সবকিছুতেই নজরদারি করা হচ্ছে। জ্বলানি ও সিগারেটের মতো বেসরকারিভাবে আমদানি হওয়া কিছু পণ্যে ফি আদায়ের কথাও বলেছেন গাজাবাসীদের ১০ জন। তাদের তিনজন সরাসরি বাণিজ্যে জড়িত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top