‘হঠাৎ পরপর বিস্ফোরণ। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে আগুন। পুড়ে যায় লাইফবোটও। তেল ছড়িয়ে পড়ে জাহাজের চারদিকে। একমাত্র ভরসা লাইফজ্যাকেট পরে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ারও উপায় ছিল না। কারণ, সেখানে প্রচণ্ড ঠান্ডায় জমে যাব। বাঁচার আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। শেষবিদায় নিচ্ছিলাম একজন আরেকজনের কাছ থেকে।’
এভাবেই কৃষ্ণসাগরে এমটি কায়রোস নামে তেল পরিবহনকারী জাহাজে ইউক্রেনের নৌবাহিনীর ড্রোন হামলার সময়ের বর্ণনা দিচ্ছিলেন জাহাজটির চতুর্থ প্রকৌশলী বাংলাদেশের নরসিংদীর মাহফুজুল ইসলাম। আজ রোববার দুপুরে প্রথম আলোর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলেন তিনি।
তুরস্কের উপকূলে কৃষ্ণসাগর অতিক্রম করার সময় গত শুক্রবার দুটি ট্যাংকারে হামলা করে ইউক্রেনের নৌবাহিনী। এই দুটি ট্যাংকারের একটি এমটি কায়রোস জাহাজের ২৫ নাবিকের চারজন ছিলেন বাংলাদেশি। জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার দুটি রাশিয়ার ‘ছায়া নৌবহরের’ অংশ বলে বিবিসি জানায়।
মাহফুজুল ইসলাম ছাড়াও বাকি তিন বাংলাদেশি হলেন কুষ্টিয়ার আল আমিন, ঢাকার ধামরাইয়ের হাবিবুর রহমান এবং চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার আজগর হোসাইন। তাঁরা সবাই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে এখন তুরস্কের একটি হোটেলে রয়েছেন।
হামলার মুহূর্তের কথা বর্ণনা দিয়ে তুরস্ক থেকে প্রকৌশলী মাহফুজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, তেল পরিবহনের জন্য খালি ট্যাংকার নিয়ে মিসরের পোর্ট সুয়েজ থেকে রাশিয়ায় নভোরোসিস্ক বন্দরের যাচ্ছিলাম। শুক্রবার বসফরাস প্রণালি অতিক্রম করে আমরা তখন কৃষ্ণসাগর অতিক্রম করছিলাম। স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৪৬ মিনিটে প্রথম হামলা হয় প্রপেলারে।
মাহফুজুল ইসলাম বলেন, আমাদের ট্যাংকারের দিকে তিনটি নৌযানের মতো ড্রোন দ্রুতগতিতে ছুটে আসছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রথম প্রপেলারে আঘাত হানে। বিকট শব্দ হয়। সঙ্গে সঙ্গে জাহাজে তীব্র ঝাঁকুনি। সবাই হতচকিত হয়ে যাই। জাহাজের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়।

এ পরিস্থিতিতে জাহাজের ক্যাপ্টেন ঘোষণা দেন, সবাইকে দ্রুত ব্রিজে যাওয়ার জন্য। আমি তখন কেবিন থেকে বেরিয়ে ওপরে ওঠার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। ঠিক ১০ মিনিট পর দ্বিতীয় ড্রোন আঘাত হানে। জাহাজ চালানোর জন্য যেখানে তেল থাকে সেখানেই দ্বিতীয় হামলা হয়। বিস্ফোরণের পর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। ট্যাংকারে ১ হাজার ১৬৩ টন জ্বালানি তেল ছিল তখন।
মাহফুজুল ইসলাম বলেন, ‘ব্রিজে যাওয়ার পর আমাদের চিন্তা তখন কীভাবে নিরাপদে উদ্ধার হব। তুরস্কের কোস্টগার্ডকে জানানো হয়। তাদের আসতে এক ঘণ্টা সময় লাগবে বলে জানায়। এর মধ্যে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে একটি লাইফবোট নামিয়ে আমাদের উদ্ধারের জন্য আসে। তবে জাহাজের চারদিকে ছড়িয়ে পড়া তেলে আগুন জ্বলতে থাকায় নৌযানটি আমাদের উদ্ধার করতে পারেনি। তখনই ভয় চেপে বসে।’
জাহাজে ক্যাডেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন কুষ্টিয়ার আল আমিন। হোয়াটসঅ্যাপে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আগুন যখন ছড়িয়ে পড়ছিল তখন দ্রুত লাইফবোট নামানোর চেষ্টা করি। ক্যাপ্টেনের নির্দেশমতো আমিসহ তিনজন চেষ্টা করছিলাম, যাতে জাহাজের লাইফবোটে আগুন না ধরে। বাতাসের গতিবেগের কারণে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। লাইফবোটে আগুন ধরে বিস্ফোরণ হয়। চারদিকে দাহ্য পদার্থ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে।
ঢাকার ধামরাইয়ের হাবিবুর রহমান ছিলেন জাহাজটির নাবিক। তিনি জানান, ‘আমরা একজন আরেকজনের কাছ থেকে মাফ চেয়ে নিচ্ছিলাম। মনে হয়েছে, বাঁচার আর কোনো আশা নেই। মৃত্যুর দুয়ার থেকে যেন ফিরে এলাম।’ জাহাজটিতে নাবিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার আজগর হোসাইন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাহাজে যখন আক্রমণ হয় তখন আমি ডেকে ছিলাম। দেখি—তিনটি স্পিডবোট আমাদের অনুসরণ করছে। তাৎক্ষণিকভাবে ক্যাপ্টেনকে জানাই। হামলার পর বুঝতে পারি—আসলে এগুলো ছিল ড্রোন।’
আজগর হোসাইন বলেন, ‘সেই মুহূর্তের কথা ভাবলে এখনো গা শিউরে ওঠে। চারদিকে আগুন। লাইফ জ্যাকেট পড়ে আছি। কিন্তু সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ প্রচণ্ড ঠান্ডা। আবার পানিতেও আগুন। তুরস্কের কোস্টগার্ড উদ্ধার না করলে আমাদের বেঁচে ফেরা হতো না।’

দুর্ঘটনার পর থেকে নাবিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠনে যোগাযোগ শুরু করেছিলেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে, হামলার খবর জানার পরই আমরা তুরস্কের ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। জরুরি সহায়তা লাগলে সেটা আর্থিক, চিকিৎসা বা অন্য কোনো সহায়তার দরকার হলে যেন সহযোগিতা করে। তবে জাহাজ মালিক ও তুরস্ক কর্তৃপক্ষ সব সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। নাবিকেরা নিরাপদে আছে—এটাই বড় খবর।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশি নাবিকদের মৃত্যুঝুঁকির মুখে পড়ার এটি দ্বিতীয় ঘটনা। এর আগে ২০২২ সালের ২ মার্চ ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে রাশিয়ার মিসাইল হামলার শিকার হয় বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার সমৃদ্ধি’। এ হামলায় নিহত হন জাহাজটিতে দায়িত্বরত প্রকৌশলী হাদিসুর রহমান। পরে জাহাজটিতে আটকে পড়া ২৮ নাগরিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়।




